তিন জোটের রূপরেখা: ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা
জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৮২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে জারি করেন সামরিক শাসন। আশির দশকজুড়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন হয়। আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্বে ১৯৯০ সালের ১৯ নভেম্বর আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও বামপন্থী দলগুলোর নেতৃত্বাধীন ‘তিন জোটের রূপরেখা’ ঘোষণা করে ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক কাঠামো হাজির করে।
ওই রূপরেখায় নির্বাচনে ভোট ডাকাতি, মিডিয়া ক্যু এবং ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করা হয়। ভবিষ্যতে কেউ যেন এ ধরনের কর্মকাণ্ড করতে না পারে, সে লক্ষ্যে ব্যক্ত করা হয় দৃঢ় সংকল্প। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, নব্বই–পরবর্তী নির্বাচনী অভিযাত্রার প্রথম ধাপে তৎকালীন বিএনপি সরকার নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার অধীনে নির্বাচনের অঙ্গীকার থেকে সরে আসে। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি দলীয় সরকারের অধীন একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি আবারও ক্ষমতায় আসে। কিন্তু আন্দোলনের চাপে দেড় মাসের কম সময়ের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনে বাধ্য হয় তারা। নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন নির্বাচনে জেতে আওয়ামী লীগ। এখানে দুটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। প্রথমত, বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে, দলীয় সরকারের অধীন কখনো সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি। দলীয় সরকারের অধীন নির্বাচনে ওই দলকে কখনো হারানো যায়নি। আবার নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন নির্বাচনে আগের সরকার কখনো ক্ষমতায় আসেনি। দ্বিতীয়ত, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে বিএনপি মাত্র দুই মাস ক্ষমতায় টিকতে পেরেছিল। ওই একই কাজ করে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় টিকে থেকেছে দীর্ঘ এক যুগ। তিন জোটের রূপরেখা বাস্তবায়িত না হওয়ার পেছনে রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছার অভাবকেই দায়ী করা হয়। এ কথা আংশিক সত্য। তবে সেই সঙ্গে রূপরেখা বাস্তবায়নের পদ্ধতিগত ত্রুটির বিষয়টিও এড়ানো যায় না। তিন জোটের রূপরেখায় দেশে ‘স্থায়ী গণতান্ত্রিক ধারা’ এবং ‘প্রকৃত জনপ্রতিনিধিত্বমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার’ অঙ্গীকার করা হয়েছিল। কোনো দল বা গোষ্ঠী কর্তৃক অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতা দখলের অবসান ঘটিয়ে সাংবিধানিক পন্থায় অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার হাতবদল ও হস্তান্তর নিশ্চিত করাও আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সার্বভৌম সংসদ প্রতিষ্ঠা করাকে তিন জোটের রূপরেখা আন্দোলনের ‘কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তু’ হিসেবে নির্ধারণ করেছিল। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর কোনো নির্বাচিত গণপরিষদের অধীনে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার উপযোগী সংবিধান গ্রহণ করা হয়নি। পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের আরোপিত লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডারের (এলএফও) অধীন যাঁরা নির্বাচিত হয়েছিলেন, ম্যান্ডেট না থাকা সত্ত্বেও তাঁরাই স্বাধীন দেশের সংবিধান প্রণয়ন করেছিলেন। রচিত হয়েছিল একব্যক্তিকেন্দ্রিক ও একদলীয় একটি সংবিধান। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, আশির দশকের সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী তিনটি রাজনৈতিক জোট রাষ্ট্র গঠনের এই আদি পাপকে শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছিল। সংসদকে ‘সার্বভৌম’ ধরে ব্যবস্থা পরিবর্তনের ইশতেহার হাজির না করে স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীন অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি জানানোকেই ‘গণতন্ত্র’ ধরে নেওয়া হয়েছিল। ফলে স্বৈরাচারের পতন ঘটলেও স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা বহাল তবিয়তে থেকে গেছে।
Comments
Post a Comment